দারিংবাড়ি-গোপালপুর

এবছরের ছুটির লিস্টটা বেরিয়েছিল একটু দেরী করে – জানুয়ারীর ১৫ র দিকে। তারপর, একটানা ছুটির দিনগুলো জড়ো করে কয়েকটা ট্রিপের নকশা ঠিক করতে করতে কেটে গেছিল আরও হপ্তাখানেক। বছরের প্রথম ট্রিপের গন্তব্য ছিল সিমলিপাল। পরের ট্রিপটা ফ্যামিলি ট্রিপ; বৈশাখের গরমে দিন পাঁচেকের ছুটিতে। কাজেই, একটু পাহাড়ের দিকে যাবারই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু জানুয়ারীর শেষে উত্তরবঙ্গের কোনও ট্রেনের টিকিটই পাওয়া গেলনা; অগত্যা বাধ্য হয়েই ঠিক করলামঃ দারিংবাড়ি-গোপালপুর

প্রস্তুতিঃ

বছর দুই-তিনেক আগেই দারিংবাড়ি ঘুরতে গেছিল তন্ময়দা। তাই ট্রেনের টিকিটগুলো বুক করেই ওকে ফোন করলাম। ওর কথামত হোটেল বুক করে রাখলাম দারিংবাড়ির Deers Eco Home (www.ecohome.org.in) আর গোপালপুরের OTDC-র পান্থনিবাস (www.ecotourodisha.com)-এ। ইচ্ছে না থাকলেও, ভোটের সময় বলে শেষমেশ গাড়ীও বুক করে ফেললাম পাত্র ট্রাভেলস (www.patratravels.com) থেকে ।

১ম দিনঃ

সন্ধ্যে ৬ টায় ট্রেন ছাড়ার কথা শালিমার (SHM) স্টেশন থেকে। সেইমত বাড়ি থেকে ডিনার প্যাক-ট্যাক করে নিয়েছিলাম। জানি, এবার সময়মত Ola থেকে একটা গাড়ী বুক করেই বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু শালিমার যেতে হবে শুনে, পরের পর ক্যাব-ড্রাইভাররা ট্রিপ বাতিল করতে থাকলো। উপায় না দেখে শেষে আমি হাওড়ার জন্যে গাড়ী বুক করলাম। মালপত্র চাপিয়ে আর আধ ঘন্টার অনিশ্চয়তা কাটিয়ে, শেষমেশ রওনা দিলাম ৪.৩০ এর দিকে। গাড়ী যখন হাওড়া ব্রিজে উঠবে উঠবে করছে, অ্যাপে গন্তব্য পাল্টালাম। এসে পৌঁছলাম শালিমার।

এই প্রথম শালিমার স্টেশন আসা। ফাঁকা, ভাঙ্গাচোরা, এলোমেলো স্টেশনের চারপাশেই মেরামতির কাজ চলছে। সেসবে পাত্তা না দিয়ে বসার বেঞ্চগুলোতে চায়ের আড্ডা জমিয়েছে বিকেলে হাঁটতে বেরোন বয়স্ক লোকজনরা। একটা করে চা শেষ করতে করতেই, ৫.৪০ এর দিকে এসে পৌঁছল ২২৮৫৩ শালিমার বিশাখাপত্তনম সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_1

ট্রেন মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। আমি ধীরেসুস্থে লাগেজগুলো সিটের নীচে গুছিয়ে নিলাম। আর, উজান আপার-বার্থে উঠে সাজিয়ে নিল বালিশগুলো।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_2a

কাজ-টাজ সেরে যখন আরেকটা চায়ের অর্ডার দিচ্ছি, আমাদের ট্রেন ছেড়ে দিল। কাকভোরে নামতে হবে বলে, রাতের খাবারও সেরে নিলাম খড়্গপুর ছাড়তেই। ডিনারের পর, পাত্র ট্রাভেলসে ফোন করে ড্রাইভের নাম্বারটা জোগাড় করেই শুয়ে পড়লাম।

২য় দিনঃ

ভোর ৪.১০ এর দিকে পৌঁছলাম ব্রহ্মপুর (BAM) স্টেশনে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_3

পাত্র ট্রাভেলসে বুক করা গাড়িটার আসার কথা ছিল ৪টের মধ্যে। কিন্তু, রাস্তায় টায়ার পাংচার করে-টরে সে এসে পৌঁছলো প্রায় দেড় ঘন্টা পরে। শেষপর্যন্ত, গাড়ী ছাড়ল সকাল ৬ টায়।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_4

আসিকা মোড়ে ব্রেকফাস্ট সেরে এগিয়ে চললাম, অদূর দিগন্তে পাহাড়ের রেখা ধরে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_5

দারিংবাড়ি Deers Eco Home-এ পৌঁছলাম প্রায় ৯.৩০ এর দিকে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_62

বাজার থেকে দূরে, ছোট্ট পাহাড়ের গায়ে হোটেলটা। আকাশ ছুঁতে চাওয়া পাইন বনের সার; আর তার পাশে সারি সারি বাংলো টাইপের ঘর। সামনের খোলা কংক্রিটের উঠোনে এসে বসলেই পরতে পরতে চোখে পড়বে মেঘ আর পাহাড় (দার্জিলিং বলেছি নাকি?)।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_5a

চেক-ইন করে একেবারে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলাম সারা দিনের মত। লম্বা বিশ্রাম পর্ব চলল লাঞ্চের পরের ভাতঘুম সারা অবধি। ৩টের দিকে রোদের তেজ একটু কমতে সবাই মিলে হেঁটেই বের হলাম চারপাশটা দেখে নিতে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_10

লাল মাটির দেশে, আলটপকা পাহাড়ী গাছেদের ভিড়ের মাঝে ছবি তোলা হল অজস্র।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_9

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_6

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_8

শেষ অবধি, চারি চকের বাজার অবধি হেঁটে এসে …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_11

… হোটেলের দিকে ফেরা শুরু করলাম। হাঁটার ক্লান্তি জুড়োলাম চা দিয়ে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_12

সন্ধ্যেয় পিঁয়াজির সাথে আরেক প্রস্থ চা দিয়ে যখন প্রায় জমিয়ে দিচ্ছিলাম, তখনও কিন্তু বেশ গরমই। টিভি দেখছিলাম না নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলাম, ঠিক খেয়াল নেই; দেখলাম ফেসবুকে মাসতুতো দিদি স্ট্যাটাস আপডেট দিয়েছেঃ চেকড-ইন অ্যাট গোপালপুর। ব্যস, তড়িঘড়ি দিদির সাথে যোগাযোগ করে ডেকে নিলাম দারিংবাড়িতে আর বুক করে নিলাম আরেকটা রুম।

ডাইনিং রুমে যখন রাতের খাবার খেতে গেলাম, ততক্ষণে চারপাশটা বেশ ঠান্ডা হয়ে পড়েছে। শীতের সময় একেবারে বরফ না পড়লেও, কনকনে একটা ঠান্ডা যে পাওয়াই যায়, সেটা আঁচ করতেই পারলাম।

৩য় দিনঃ

সকাল সকাল আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথম গন্তব্যঃ মিদুবন্দা জলপ্রপাত। মিনিট পনেরোর পাকা রাস্তার পর কাঁচা রাস্তায় …

… আরও মিনিট কুড়ি যাবার পর পৌঁছলাম উদ্দিষ্টে। প্রায় দুশোর কাছাকাছি সিঁড়ি ভেঙ্গে …

… এলাম মিদুবন্দা (বা দাসিংবাড়ি বা দারিংবাড়ি) জলপ্রপাত। গরমের দিনে জলের পরিমাণ কম; তবু, এখানকার শান্ত মনোরম আবহে …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_15

… প্রকান্ড সব গাছপালার ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিলাম খানিকক্ষণ।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_15a

এগিয়ে চললাম পরের গন্তব্যঃ পাইন ফরেস্ট

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_15b

কৃত্রিম এই জঙ্গলে সার দিয়ে লাগানো আছে পাইন।

পড়ে থাকা পাইন বীজ কুড়োতে কুড়োতে তুলে নিলাম কিছু ছবিও।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_21

বিশ্রামের অবকাশে, সেরে নিলাম হালকা খাওয়াদাওয়াও।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_19

উজান তখন খেলা করছে মাটিতে পড়ে থাকা পাইন গাছের ঝুরিগুলো নিয়ে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_20

এবার যাবার পালাঃ কফি প্ল্যানটেশন, একটা পার্ক যেখানে কফি আর গোলমরিচের প্রদর্শনীমূলক চাষ হয়।

বেরিয়ে এলাম প্রায় সাথেসাথেই …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_24

… আর, পাইন আর সবুজ পাহাড় ধাওয়া করে …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_25

… ঘন্টাখানেকেই পৌঁছলাম লাভার্স পয়েন্ট-এ।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_26

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_27

গরমের জন্যে সবাই খুব অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম; তাই খানিক বিশ্রামের পর …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_28

… স্থানীয় বাচ্চাদের সাথে দেখতে চললাম একটা গুহা। পৌঁছে দেখলাম নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার; বরং নদীর পাশ দিয়ে পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা রাস্তাটাই আমার বেশী মনে ধরলো।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_29

দুপুর হয়েই এসেছিল; তখন হোটেলে ফেরার পালা। তবে ফেরার পথে দেখে নিলামঃ এমু চিড়িয়াখানা

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_30

তারপর হোটেলে ফিরে চাট্টি ভাত খেয়েই ছোট্ট করে ঘুমটা সেরে নিলাম। ড্রাইভার যখন ডেকে তুললো, প্রায় ৪টে। রোদ তখনও কমেনি বলে ল্যাদ খেতে খেতে গিয়ে বসলাম গাড়ীতে। কিন্তু বসতে না বসতেই এসে গেলঃ ন্যাচার পার্ক

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_31

নামমাত্র ১০ টাকার প্রবেশমূল্য দিয়ে ঢুকলাম ন্যাচার পার্ক। এই পার্ক জুড়ে রয়েছে এখানকার বনবাসী আর আদিবাসী জীবনের প্রদর্শন।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_32

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_33

স্তরে স্তরে সবুজ পেরিয়ে আমরা এলাম, প্রজাপতি পার্ক।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_36

সাজানো ফুলের বিশাল বাগানে …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_37

… রংবেরং-এর ফুল দেখতে দেখতেই কেটে গেল আধঘন্টা মত।

একটু তাড়াহুড়ো করেই তাই বেরিয়ে আসতে হল, তার উল্টোদিকেরই আরেকটা পার্কে।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_42

হিল ভিউ পার্ক; প্রচুর জীবজন্তুর মডেল আর বাচ্চাদের জন্যে রাইড দিয়ে সাজানো এই পার্কেও প্রবেশমূল্য সেই ১০ টাকা।

পার্কের ভেতরের দিকে রয়েছে একটা ওয়াচ-টাওয়ার, যেখান থেকে একদিকে দেখা যাবে পাশের পাহাড়-ঘেরা উপত্যকা, আরেক পাশে পাইনের ভিড়।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_45

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_46

সূর্য প্রায় ডুবে আসছে দেখে আমাদের বেরিয়েই পড়তে হল, দিনের শেষ গন্তব্যেঃ সাইলেন্ট ভ্যালি। যদিও সূর্যাস্তের অপেক্ষায় জড়ো হওয়া বাঙালিদের ভিড়ের সুবাদে সাইলেন্টটাই ‘সাইলেন্ট’ ছিল।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_48

সূর্যাস্তের সাথে সাথে পরের পর পাহাড়ের স্তর যখন মিলিয়ে যেতে, ফিরে এলাম হোটেলে। সন্ধ্যের চায়ের আসরে ভিড় করছিলো স্মৃতিচারন আর পরিকল্পনা; কিন্তু বৃষ্টির আচমকা প্রতিশ্রুতিতে আড্ডা ভাঙ্গতেই হলো। যদিও বৃষ্টি যখন ঝেঁপে নামলো, আমাদের ডিনার শেষ। শেষ আমাদের দারিংবাড়ির পালাও।

৪র্থ দিনঃ

দিদিরা আগেই ঘুরে ফেলেছে বলে, ওদের বাড়ি ফেরার পালা। আর, আমরা পালা গুটিয়ে রওনা হলাম গোপালপুরের দিকে। গোপালপুর পান্থনিবাসে পাশাপাশিই দুখানা স্যুইট বুক করা ছিল।

রুমে ঢুকেই আগে সেরে নিলাম ব্রেকফাস্ট। তারপর লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে রোদ্দুরের পরোয়া না করেই বেরিয়ে পড়লাম বীচটা দেখতে। হোটেলের কম্পাউন্ড থেকে নেমে গেছে একটা লম্বা সিঁড়ি।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_51

সিঁড়ি থেকে নেমে বালির ওপর দিয়ে আরও মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর প্রথম দেখতে পেলাম বীচ।

সমুদ্রের দিকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া বীচে তখন চান করছে শুধু দুজন।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_54

গরম বালির ওপর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে, আমিও ফিরে এলাম তখনই। চান আর লাঞ্চ সেরে যখন আমরা রুমে ঢুকছি, আকাশ একটু মেঘলা হয়ে আসছিল। ঘুম সেরে যখন বীচে চান করতে যাবার জন্যে বেরোচ্ছি, তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।

বীচের বাঁদিকে অল্প দূরে দেখা যাচ্ছে গোপালপুর লাইট হাউস, …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_55

… ডানদিকে সূর্য প্রায় ডুবেই যাচ্ছে আর …

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_56

চোখের সামনে সমুদ্রে জোয়ারের দাপট। ঢালু বীচে আর জোয়ারের ঢেউ-এ চানটা ঠিক যুতসই হলনা।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_57

খানিক পরেই উঠে এলাম আর হোটেলে আরেক প্রস্থ চান সেরে বেরিয়ে পড়লাম বীচের সেই দিকটায়, যেখানে দোকানের মেলা বসে গেছে।

সন্ধ্যের অন্ধকারে চাঁদের আলো এসে পড়েছে সমুদ্রের জলে। অল্প দূরে লাইট হাউসেও জ্বলছে সার্চলাইট। এসব কিছু মোহাবিষ্টের মত দেখতে দেখতেই ডিনারের সময় হয়ে গেল।


একটা অটো করে ফিরে এলাম হোটেলে আর ডিনার সেরে শুয়েও পড়লাম।

৫ম দিনঃ

কালকের অটোটাই বলা ছিল আমাদের স্টেশনে নিয়ে যাবার জন্যে। তাতে করেই সময়মত পৌঁছলাম ব্রহ্মপুর।

daringbari_upperberth_krishnendu_ghosh_64

ট্রেনের খাবারে রুচিসম্মত অরুচি থাকায় ব্রেকফাস্ট করলাম স্টেশন চত্বরে; এমনকি লাঞ্চও প্যাক করে নিলাম। ১২৭০৪ ফলকনামা এক্সপ্রেস যখন আমাদের নিয়ে হাওড়া (HWH) এসে পৌঁছল; ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি যে চার দিনের এই ছোট্ট ট্রিপ আসলে একটা অ্যাপেটাইজার।

Advertisements